ধ্বংসের পথে আলেকজান্ডার ক্যাসেল

আতাউর রহমান জুয়েল, ময়মনসিংহ
১০ অক্টোবর ২০২১, ১১:২৩আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২১, ১৫:৫৪

অযত্ন, অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসের মুখে ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত ময়মনসিংহের লোহারকুঠি খ্যাত আলেকজান্ডার ক্যাসেল। প্রাকৃতিক উপায়ে ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত’ এই বাগানবাড়িতে একসময় অবস্থান করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রুশ যুবরাজ ডিউক, লর্ড কার্জনের মতো দেশি-বিদেশি বরেণ্যরা। ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক লোহারকুঠিটি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও দেখভালের কেউ নেই।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, মুক্তাগাছার জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরীর তৃতীয় প্রজন্ম রঘুনন্দন আচার্য চৌধুরী নিঃসস্তান ছিলেন। সম্পত্তির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তখনকার রেওয়াজ অনুযায়ী পুত্রসন্তানের ভীষণ দরকার ছিল তার। শেষে দত্তক নেবেন বলে ঠিক করেন। পরে গৌরীকান্ত আচার্য চৌধুরীকে দত্তক নেন রঘুনন্দন। মৃত্যুর আগে সেই পুত্রের হাতেই জমিদারি অর্পণ করেন।

গৌরীকান্তর প্রতিও সদয় ছিল না নিয়তি। সন্তানহীন অবস্থায় মারা যান তিনি। গৌরীকান্তের বিধবা স্ত্রী বিমলা দেবী দত্তক নিলেন কাশীকান্তকে। কাশীকান্তের কপালও মন্দ। রোগে ভুগে সন্তানহীন অবস্থায় পরলোকগমন করেন তিনি। তার স্ত্রী লক্ষ্মী দেবী আচার্য চৌধুরানী পূর্বসূরীদের পথ অনুসরণ করে দত্তক নেন চন্দ্রকান্ত আচার্য চৌধুরীকে।

চন্দ্রকান্তও দ্রুত ত্যাগ করেন পৃথিবীর মায়া। হাল ছাড়েননি লক্ষ্মী। দত্তক নেন আবার। দ্বিতীয় দত্তক পুত্রের পূর্বনাম পূর্ণচন্দ্র মজুমদার। কুলগুরুর সামনে মহাসমারোহে লক্ষ্মী দেবী নতুন নাম রাখলেন সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী।

সূর্যকান্তর শাসনামলে ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী জনপদে যুক্ত হলো নতুন মাত্রা। প্রায় ৪১ বছর জমিদারিতে বহু জনহিতকর কাজ করেন তিনি। ময়মনসিংহে স্থাপন করলেন একাধিক নান্দনিক স্থাপনা।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত হয় লোহারকুঠি। ১৮৭৯ সালে বাগানবাড়ি হিসেবে ময়মনসিংহ শহরে ৯ একর ভূমির মাঝে নির্মাণ করেন দ্বিতল লোহারকুঠি। পরে তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নামে এর নাম রাখা হয় আলেকজান্ডার ক্যাসল।

লোহা, কাঠ ও টিন দিয়ে এই কুঠি নির্মাণে প্রাকৃতিকভাব শীতল রাখতে সিলিংয়ে ব্যবহার করা হয় ফ্রান্স থেকে আনা আব জাতীয় দুর্লভ এক বস্তু। তখন ভবনটির চারপাশে ছিল দিঘি ও বাগান।

জমিদারদের শাসনামল শেষে এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আলেকজান্ডার ক্যাসেলটি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

স্থানীয় কথাসাহিত্যিক ফরিদ আহমদ দুলাল জানান, ব্রিটিশ আমলে ১৯২৬ সালে এই বাগানবাড়িতে এসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে এসেছেন রাশিয়ার যুবরাজ, লর্ড কার্জন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহসহ অনেক গুণী।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক এই লোহারকুঠিরের বর্তমান দুরাবস্থায় হতাশ এই কথাসাহিত্যিক। তিনি জানান, একসময়কার দৃষ্টিনন্দন আলেকজান্ডার ক্যাসেলের লোহা ও কাঠ ভেঙে পড়ছে, খসে পড়ছে পলেস্তারা। সামনে থাকা নারীর ভাস্কর্যটি এখনও কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অন্তত এর সৌন্দর্য ধরে রাখতে এখনই উদ্যোগ নেওয়ার দাবি করেছেন এই সাহিত্যিক। 

লোহারকুঠি কিংবা আলেকজান্ডার ক্যাসেল দেখতে এখনও ভিড় জমান দর্শনার্থীরা। এর রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়ে দর্শনাথী স্কুল শিক্ষিকা মাহমুদা মলি জানান, ছোটবেলা থেকে এই আলেকজান্ডার ক্যাসেলের সৌন্দর্য দেখে বড় হয়েছেন। এখন এর অবস্থা দেখে কান্না আসে তার।

তিনি আরও জানান, আলেকজান্ডার ক্যাসেলের সামনে এলেই ছোটবেলার অনেক স্মৃতি ভেসে ওঠে। এটিকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছে দাবি জানান মলি। 

ময়মনসিংহের পরিবেশবাদী অ্যাডভোকেট শিব্বির আহমেদ লিটন জানান, আলেকজান্ডার ক্যাসেলটির দৃষ্টিনন্দন সংস্কার করে লেকটি খনন করলে এটি ময়মনসিংহের একটি পর্যটনকেন্দ্র হতে পারতো। বিগত দিনে এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখে জেলা প্রশাসক বরাবর জনউদ্যোগের পক্ষ থেকে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছিল।

এখন ক্যাসলটি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের নামমাত্র গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এটি মেরামতের উদ্যোগ নেয়নি কলেজ কর্তৃপক্ষ। কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মঈন উদ্দিন জানান, ২০১৯ সালে আলেকজান্ডার ক্যাসেলসহ ৯ একর জমি সরকার প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরে ন্যস্ত করার একটা উদ্যোগ গ্রহণ করে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের ময়মনসিংহ জাদুঘরের ফিল্ড অফিসার সাবিনা ইয়াসমিন জানান, ২০১৯ সালে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে আলেকজান্ডার ক্যাসেলটিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরে ন্যাস্ত করতে সরকার একটি গেজেট করেছে। তবে করোনার প্রাদুর্ভাবে কাজটি এগোয়নি। এটি কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বুঝে নেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। পুরোপুরিভাবে অধিদফতরে ন্যস্ত হলে এর সৌন্দর্য ধরে রাখতে প্রকল্প নেওয়া হতে পারে জানান তিনি।

/এফএ/
সম্পর্কিত
সেনাবাহিনীর সহায়তায় সাজেক ছেড়েছেন দেড়শ’ পর্যটক, এখনও আটকা ৪১১ জন
কক্সবাজারে হোটেল বুকিং বাতিল করেছেন ৫০ হাজার পর্যটক
সাজেকে আটকে পড়েছেন ৬০০ পর্যটক, ফিরবেন কীভাবে
সর্বশেষ খবর
বিয়ে-সন্তান চান তরুণরা, পিছিয়ে দিচ্ছে আর্থিক অনিশ্চয়তা
বিয়ে-সন্তান চান তরুণরা, পিছিয়ে দিচ্ছে আর্থিক অনিশ্চয়তা
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে ৩ মাসের শিশুর মৃত্যু
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে ৩ মাসের শিশুর মৃত্যু
দমকলকর্মীদের ‘মানসিক সমর্থন’ দিতে হাজির ছাগল গোল্ডি
দমকলকর্মীদের ‘মানসিক সমর্থন’ দিতে হাজির ছাগল গোল্ডি
বিশ্বকাপে গোল মিস করা ফুটবলারকে হত্যার হুমকি
বিশ্বকাপে গোল মিস করা ফুটবলারকে হত্যার হুমকি
সর্বাধিক পঠিত
ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা শেখ হাসিনার: রয়টার্স
ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা শেখ হাসিনার: রয়টার্স
এখনও অন্ধকারে জাপান গার্ডেন সিটির ৯ ভবন
এখনও অন্ধকারে জাপান গার্ডেন সিটির ৯ ভবন
সরকারি শিশু পরিবারে কীভাবে অন্তঃসত্ত্বা হলো কিশোরী, বরখাস্ত ৫ কর্মকর্তা
সরকারি শিশু পরিবারে কীভাবে অন্তঃসত্ত্বা হলো কিশোরী, বরখাস্ত ৫ কর্মকর্তা
নেশাগ্রস্ত পিতার আঘাতেই প্রাণ হারায় মেয়ে: আদালতে মা
নেশাগ্রস্ত পিতার আঘাতেই প্রাণ হারায় মেয়ে: আদালতে মা
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল চালায়নি, তাহলে ইরানে হামলা চালালো কোন দেশ
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল চালায়নি, তাহলে ইরানে হামলা চালালো কোন দেশ